বাঁচতে হলে বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে
বাঁচতে হলে বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে
 
 
বাংলাদেশ সরকার আমাদের সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে কতিপয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালত এর রায়ে দেশের সংবিধানে কতিপয় পরিবর্তন সাধন করেছে। পরিবেশ সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে এমন অংশে ও এমনভাবে সংযোজন করতে হবে যাতে সে বিধানগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য কোন একটি প্রক্রিয়া থাকে, যেমনটি রয়েছে আমাদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের জন্য। অর্থাৎ সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রকে শুধু পরিবেশ সুরক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করলেই তা যথেষ্ট হবে না, নাগরিকদের পরিবেশ সংক্রান্ত একটি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং তা সংযোজন করতে হবে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে, আমাদের মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে। কেবল তবেই নাগরিকরা পরিবেশের অধিকারকে বাস্তবায়িত করার সুযোগ পাবে। আজ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১০ শনিবার সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এর উদ্যোগে “বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি” শীর্ষক সেমিনারে এ অভিমত ব্যক্ত করা হয়। 
 
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন-, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’র সভাপতি সংসদ সদস্য আব্দুল মোমিন তালুকদার, বিশেষ অতিথি জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংক্রান্ত সর্বদলীয় পার্লামেন্টরি কমিটি’র চেয়ারম্যান সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী ও মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন, আবু নাসের খান, পবা’র সাধারন সম্পাদক কামাল পাশা চৌধুরী এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার আবু রায়হান মু. খালিদ। এছাড়া আরো বক্তব্য রাখেন- অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম, ড. হালিমদাদ খান, বাংলাদেশ সাংবাদিক ফোরামের কামরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান, ড. নুরুল আলম, অ্যাডঃ সোহানা প্রমুখ।
 
বিশেষ অতিথি, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান-, যে কোন বিষয়ের সুনির্দিষ্ট আইন যেমন থাকতে হবে তেমনি এর যথাযথ প্রয়োগও থাকতে হবে। তানাহলে আমরা কাঙ্খিত ফলাফল পাবো না। আইনকে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে অনেকের তুলনায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে বিচারক ও আইনজীবীরা। তারা যদি অন্য কোন কারণে প্রভাবিত না হয়ে আইনের সঠিক বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে, সেজন্য তাঁদেরকে আরো বেশি দায়িত্বশীল ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হতে হবে। তা নাহলে আজকের এই মহতি উদ্যোগ সম্পূ র্নরূপে ব্যর্থ হবে।  
 
বিশেষ অতিথি, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংক্রান্ত সর্বদলীয় পার্লামেন্টরি কমিটি’র চেয়ারম্যান সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন-, আমাদের অনেক বিষয়ের সাথে অনেকেরই দ্বীমত আছে কিন্তু পরিবেশ বিষয়টি সকলের জন্যই সমান। ইতোমধ্যে পার্লামেন্টরি কমিটি থেকে আমরা সংবিধান সংশোধনী কমিটি’র কাছে একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি এবং আজকের এই অনুষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত যৌক্তিক প্রস্তাবনাগুলো আমি কমিটি’র কাছে তুলে ধরবো। কারণ বর্তমান সময়ে পরিবেশ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল ও সর্বোস্তরের নাগরীক সমান ভূমিকা রাখবে এবং সকলের সহযোগিতা পাব বলে আমি আশাবাদি।   
 
প্রধান অতিথি, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’র সভাপতি সংসদ সদস্য জনাব আব্দুল মোমিন তালুকদার, বলেন-, আমরা বিরোধী দলে অবস্থান করেও এই ধরণের একটি অতি জনগুরুত্বপূর্ন বিষয়ের পার্লামেন্টরী কমিটি’র চেয়ারম্যান হয়ে আমি পরিবেশ বিষয়ে ভ’মিকা রাখতে পেরে আনন্দিত। সকল বিতর্কের উর্দ্ধে এসে পরিবেশ বিষয়টিকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি করণের আন্দোলনে শামিল হতে এবং ভূমিকা রাখতে আহবান জানাই। 
 
পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন-, পরিবেশের গুরুত্ব ক্রমান্নয়ে মৌলিক অধিকার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কাজেই একে অপরিহার্য অধিকার হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ প্রয়োজন।  
 
মূল প্রবন্ধে বলেনÑ বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ন দেশ। দারিদ্র এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আমরা আমাদের স্বল্প পরিমাণ ভূমি এবং আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে অতিব্যবহার করছি। এভাবে অতিব্যবহৃত হতে হতে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ তার হারানো গুনাবলী পুণরুদ্ধারের ক্ষমতা অনেকাংশেই হারিয়ে ফেলেছে। আমাদের প্রজাতন্ত্রের মূল আইন, আমাদের সংবিধান, সেই সংবিধানে এ নিয়ে কিছু বলা নেই। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান যখন রচিত হয় পরিবেশগত সমস্যাগুলো তখনো এতটা প্রকট হয়ে উঠেনি এবং বিশ্বজুড়ে এ সংক্রান্ত সচেতনতা ও তখন অতি সামান্য। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবার এবং সুযোগ এসেছে পরিবেশ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংবিধানে অন্তুর্ভুক্ত করা। 
 
সেমিনারে সংবিধানের পরিবেশ সংক্রান্ত বিধানে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকা প্রয়োজন সেগুলো প্রকাশ করা হলো ঃ 
১. নাগরিকদের সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশের মৌলিক অধিকার; ২, সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ রক্ষায় এবং পরিবেশের উন্নতিতে রাষ্ট্রের বাধ্যকরি দায়িত্ব; ৩. সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ রক্ষায় সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বাধ্যকরি দায়িত্ব; ৪. নাগরিকের পরিবেশের মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রের ও ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ রক্ষায় বাধ্যকরি দায়িত্ব বাস্তবায়নে নাগরিকের আদালতের আশ্রয় গ্রহণের সুযোগের স্বীকৃতি; ৫. প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও প্রাণ সম্পদকে গণসম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি; ৬. প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও প্রাণ সম্পদের সকল ব্যবহারে (বাণিজ্যিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা) পরিবেশের সুরক্ষা ও উন্নয়নকে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ; ৭. সকল প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনকে সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা; ৮. রাষ্ট্র কর্তৃক সম্পাদিত সকল চূক্তি, যাতে কোন না কোন ভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশ ব্যবস্থা , প্রাণ সম্পদ বা অন্য কোন প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার জড়িত, চূড়ান্ত করার আগে জনসমক্ষে প্রকাশ ও সংসদের অনুমোদন গ্রহণ; ৯. পরিবেশ বিষয়ক সকল আন্তর্জাতিক চূক্তি, কনভেনশন ইত্যাদি বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।